নতুন উচ্চতায় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক

বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের তিন দিনের চীন সফর গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি নিয়ে এগোচ্ছে। সফরের দ্বিতীয় দিন বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত বৈঠক শেষে দুই দেশের সরকারপ্রধানের উপস্থিতিতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অবকাঠামো, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও অন্যান্য সহযোগিতা খাতে মোট ১৩টি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এর আগে বেইজিং পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীনের পক্ষ থেকে লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং সশস্ত্র বাহিনীর গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এ ছাড়া চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করার প্রক্রিয়া সহজ করতে দ্রুত লাইসেন্স প্রদানের উদ্যোগের কথাও জানানো হয়েছে।
স্বাক্ষরিত ১৩টি চুক্তির মধ্যে ডিজিটাল অবকাঠামো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং প্রযুক্তি বিনিময় সম্পর্কিত বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় যৌথভাবে কাজ করার বিষয়ে দুই দেশ অঙ্গীকার করেছে।
চীনে বাংলাদেশের প্রথম বিনিয়োগ কার্যালয়
বেইজিংয়ে আয়োজিত ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানান, চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য সরাসরি সেবা নিশ্চিত করতে চীনে বাংলাদেশের প্রথম ‘বিনিয়োগ কার্যালয়’ স্থাপন করা হবে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর অধীনে এই কার্যালয় পরিচালিত হবে বলে জানানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর মাধ্যমে চীনা উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহায়তা সহজে পাবেন।’
রাজনৈতিক পর্যায়ে নতুন যোগাযোগ
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদারেও গুরুত্ব দিয়েছে দুই দেশ। সফরে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার মধ্যে একটি পার্টি-টু-পার্টি সহযোগিতা বিষয়ক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বেইজিং সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের ডালিয়ান শহরে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সামার ডাভোস ২০২৬ সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন তিনি। সফরের এক পর্যায়ে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলঝাস বেকতেনভের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকা ও আস্তানায় স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন চালুর বিষয়ে আলোচনা হয়।
শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় জানিয়েছে, সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১০টায় বেইজিংয়ের গ্রেট হলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠক শেষে আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর শুক্রবার বিকেলেই তার ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তিস্তা মহাপরিকল্পনায় সহযোগিতা
সফরের অংশ হিসেবে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গুয়িং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে বহুল আলোচিত তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (তিস্তা মহাপরিকল্পনা) বাস্তবায়ন, নদী শাসন, ড্রেজিং এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। দুই দেশ নদী ব্যবস্থাপনা ও পানিসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের নদীগুলোর নাব্যতা বৃদ্ধি, বন্যা ঝুঁকি কমানো এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় চলমান নদী খনন (ড্রেজিং) কার্যক্রম তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা, নদীভাঙন রোধ এবং জলসম্পদ উন্নয়নে চীনের উন্নত প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী শুষ্ক মৌসুমে সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অভ্যন্তরীণ নৌপথের নাব্যতা বাড়াতেও চীনের প্রযুক্তিগত সহযোগিতা কামনা করেন।
বাংলাদেশের প্রস্তাবকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোওইং বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা বাস্তবভিত্তিক ও গবেষণানির্ভর। তিনি দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সহযোগিতার ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক এবং চীনা পানি বিশেষজ্ঞদের বাংলাদেশ সফরের বিষয়টি উল্লেখ করেন।
লি গোওইং বলেন, নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আধুনিক প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের জন্য চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান তিনি।






