দেশে বছরে ঘুষের লেনদেন ১২ হাজার কোটি টাকা

দেশের সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে ঘুষ ও দুর্নীতিতে শীর্ষে রয়েছে পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। সেবা নিতে গিয়ে দেশের ৮১.৬ শতাংশ খানা (পরিবার) কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হচ্ছেন। আর ২০২৩ সালের তুলনায় গত এক বছরে দেশে ঘুষের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৫.৯ শতাংশ।
আজ ২৫ জুন (২০২৬) ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রথম এক বছরকে (নভেম্বর ২০২৪ থেকে অক্টোবর ২০২৫) ভিত্তি ধরে এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত এক বছরে জাতীয় পর্যায়ে প্রাক্কলিত মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। এই বিপুল অর্থ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের দেশের মোট জিডিপির ০.২৩ শতাংশ এবং সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১.৫৮ শতাংশের সমপরিমাণ। ২০২৩ সালের জরিপের তুলনায় ২০২৫ সালে ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ ১৫.৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৭৬.৬ শতাংশ খানা ঘুষের শিকার হয়েছে। এই খাতে দুর্নীতির সামগ্রিক হার ৮৪.৪ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা বিআরটিএ-তে সেবা নিতে গিয়ে মানুষ চরম হয়রানি ও ঘুষের মুখোমুখি হয়েছেন। ২০২৩ সালের তুলনায় সার্বিকভাবে দুর্নীতির শিকার হওয়া খানার হার ১৫.১ শতাংশ এবং সরাসরি ঘুষের শিকার হওয়া খানার হার ২৫.২ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে একটি উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে যে, শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলের মানুষ দুর্নীতির শিকার বেশি হচ্ছেন। গ্রামাঞ্চলে পাসপোর্ট সেবায় ঘুষের হার ৭৯.১ শতাংশ, যেখানে শহরাঞ্চলে এই হার ৭১.৮ শতাংশ। তবে অর্থের পরিমাণের দিক থেকে শহরের মানুষকে তুলনামূলক বেশি অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়েছে। এই দুর্নীতির কারণে সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও ক্ষতির শিকার হচ্ছেন নিম্ন আয়ের মানুষ, নারী, আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘সেবা খাতগুলোতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও অনলাইন সেবা চালু করা হলেও তা দুর্নীতি দমনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। এখনো সাধারণ মানুষকে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব এবং ‘ঘুষ না দিলে সেবা মিলবে না’—জনগণের মধ্যে এই বাধ্যবাধকতার সংস্কৃতি তৈরি হওয়ার কারণেই দুর্নীতি ও ঘুষের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী।’
টিআইবি দুর্নীতি রোধে সেবা খাতগুলোকে সম্পূর্ণ দালালমুক্ত করা, ডিজিটাল ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জোর সুপারিশ জানিয়েছে।






