ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধান শাখা বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশনের একটি প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশে ছাত্রদের নেতৃত্বে হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে যে প্রাণঘাতী দমন অভিযান চালানো হয়েছিল, তা সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুমোদনেই হয়েছিল বলে জানিয়েছে বিবিসি।
বুধবার (৯ জুলাই) প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি ফাঁস হওয়া ফোনালাপের অডিও বিশ্লেষণ করে বিবিসি এই তথ্য পেয়েছে।
বিবিসি বলছে, ২০২৩ সালের ১৮ জুলাই রেকর্ড হওয়া ওই ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে একজন শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে কথোপকথনে বলতে শোনা যায়, “যেখানেই ওদের (বিক্ষোভকারী) পাওয়া যাবে, গুলি করা হবে”। বিবিসির যাচাই করা ওই রেকর্ডিং অনুসারে, শেখ হাসিনা তার নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে “প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার” করার অনুমতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, “প্রয়োজনে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করতে হবে” এবং “তারা (এসব বাহিনীর সদস্যরা) যেখানেই তাদের (আন্দোলনকারী) পাবে, তারা গুলি করবে”।
ব্রিটিশ ফরেনসিক অডিও বিশেষজ্ঞ দল ইয়ারশট এবং বাংলাদেশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) অডিওটি পরীক্ষা করে এটিকে অবিকৃত ও বিশ্বাসযোগ্য বলে নিশ্চিত করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি) এটি রেকর্ড করেছিল। ফাঁস হওয়া অডিওটি সম্পর্কে জানেন এমন একটি সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, গত ১৮ জুলাই নিজের সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে শেখ হাসিনা ওই ফোনালাপটি করেন। এই অডিওটি কে ফাঁস করেছে, তা নিশ্চিত নয়।
গত বছরের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের জন্য কোটা পদ্ধতির বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়, যা পরবর্তীতে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভে রূপ নেয়। এই আন্দোলনের ফলেই শেখ হাসিনাকে ১৫ বছরের ক্ষমতা হারাতে হয়।
শেখ হাসিনাসহ ৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশ ১০ জুলাই
বিক্ষোভের চূড়ান্ত সহিংসতা ঘটে গত ৫ আগস্ট। সেদিন ঢাকা থেকে গণভবন ছেড়ে হেলিকপ্টারে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা। ওই দিন শুধু ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকাতেই পুলিশের গুলিতে অন্তত ৫২ জন নিহত হয়েছিলেন। এটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ পুলিশি সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করেছে বিবিসি। জাতিসংঘের তদন্তকারীদের মতে, গত বছরের জুলাই-আগস্টে সহিংস ওই বিক্ষোভে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
বিবিসি আই ইনভেস্টিগেশন তাদের অনুসন্ধানে ৩৬ দিনের আন্দোলনের সময়কার শত শত ভিডিও, ছবি ও ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ, ড্রোন ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের ভিত্তিতে তারা দেখিয়েছে যে, সেদিন পুলিশ বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালিয়েছিল, বিশেষত যখন সেনাবাহিনী ওই এলাকা ছেড়ে যায়। বিবিসি জানিয়েছে, বিক্ষোভকারীরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ অন্তত ৩০ মিনিট ধরে গুলি চালায়, এরপর তারা সেনা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। ঘটনার পর ৬০ জন পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল বলে বাংলাদেশ পুলিশ তখন জানিয়েছিল।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ বিষয়ে খবর প্রকাশিত হলেও নির্বিচারে হত্যার ঘটনাটি কীভাবে শুরু ও শেষ হয়েছিল এবং তাতে কত মানুষ হতাহত হয়েছিল, সে সম্পর্কে বিবিসির অনুসন্ধানে নতুন তথ্য ও বিবরণ উঠে এসেছে, যা আগে সেভাবে সামনে আসেনি। অনুসন্ধানের সময় বিবিসির হাতে পাঁচ আগস্ট বিকেলে যাত্রাবাড়ীতে পুলিশের গুলিবর্ষণ শুরুর মুহূর্তগুলোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিডিও আসে। ভিডিওটি মিরাজ হোসেন নামের এক আন্দোলনকারীর মোবাইল ফোন থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, যিনি নিজেও সেদিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। মিরাজের মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করা ওই ভিডিওতে তার জীবনের শেষ মুহূর্তও ধরা পড়েছে। ভিডিওর মেটাডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেদিন নির্বিচারে গুলিবর্ষণের ঘটনাটি শুরু হয়েছিল দুপুর ২টা ৪৩ মিনিটে।
ভিডিওটিতে যাত্রাবাড়ী থানার মূল ফটকে বিক্ষোভকারীদের সামনে সেনাবাহিনীর একটি দলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়, যারা হঠাৎ করে সরে যায়। এরপর থানার ভেতরের পুলিশ সদস্যরা ফটকের সামনে থাকা বিক্ষোভকারীদের ওপর আকস্মিকভাবে গুলিবর্ষণ শুরু করে। থানার উল্টো দিকের একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ গুলি চালানো শুরু করার পর প্রাণ বাঁচাতে বিক্ষোভকারীরা গলির ভেতর দিয়ে ছুটে পালাচ্ছেন। ওই সময়ের আরেকটি ভিডিওতে আহতদের শরীরে পুলিশকে লাথি মারতেও দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে বিবিসি দেখেছে, পাঁচ আগস্ট বিকেলে যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ৩০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে ‘গণহত্যা’ চালানো হয়েছিল। ঘটনার সময়ের কিছু ড্রোন ভিডিওতে দেখা যায়, বিকেল তিনটা ১৭ মিনিটেও যাত্রাবাড়ী থানার সামনের মহাসড়কে বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালাচ্ছিল। এরপর বিক্ষোভকারীদের একটি বড় দলকে থানার উল্টো পাশের একটি অস্থায়ী সেনা ব্যারাকে আশ্রয় নিতে দেখা যায়। ড্রোন ভিডিওতে মহাসড়কের ওপর হতাহতদের একাধিক মৃতদেহ পড়ে থাকতেও দেখা গেছে। ভ্যান-রিকশা এবং বাইকে করে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন আন্দোলনকারীরা। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ শাহবাগের দিকে চলে যান। আর যারা তখনও যাত্রাবাড়ীতে ছিলেন, তাদের মধ্যে বিক্ষুব্ধ একটি অংশ থানায় আগুন দেন। এ ঘটনায় পুলিশের কমপক্ষে ছয়জন সদস্য নিহত হন।
পাঁচ আগস্ট বিকেলে পুলিশের নির্বিচার গুলির ঘটনার পর আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পর বহু ব্যক্তিকে মৃত ঘোষণা করা হয়। প্রাথমিকভাবে যাত্রাবাড়ীতে অন্তত ৩০ জন বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন বলে জানা যাচ্ছিল। কিন্তু গণমাধ্যমে প্রকাশিত তখনকার খবর, নিহতদের পরিবারের সাক্ষাৎকার, হাসপাতালের নথি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন পোস্ট যাচাই করার পর বিবিসি নিশ্চিত হয়েছে যে, ওই দিন যাত্রাবাড়ীতে কমপক্ষে ৫২ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। এর বাইরে সেদিন আরও অন্তত ছয়জন পুলিশ নিহত হয়েছিলেন।
আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলি ও হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বাংলাদেশ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাহিনীর একজন মুখপাত্র ঘটনা স্বীকার করে বিবিসিকে বলেছেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে তৎকালীন পুলিশ বাহিনীর কিছু সদস্য অতিরিক্ত বলপ্রয়োগে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে অপেশাদার আচরণ করেছিলেন।”
যদিও শেখ হাসিনা ও তার দল সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেছেন, অডিওটি “অবৈধ কোনো মনোভাব” প্রমাণ করে না এবং তাদের মতে এটি ছিল “প্রাসঙ্গিক প্রতিক্রিয়া”।
মূলত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কথোপকথনের এই ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ডিংটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ যে, গত গ্রীষ্মে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের অনুমতি তিনি নিজেই দিয়েছিলেন। এই অডিওটি এখন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। গণহত্যা, সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতা, উস্কানি ও ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতেই বর্তমানে তার বিচার চলছে। তিনি বর্তমানে ভারতে পালিয়ে আছেন এবং ভারত সরকারের কাছে তার প্রত্যার্পণের অনুরোধ জানানো হলেও তারা এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
স্বাআলো/এস
