গত বছরের তুলনায় পাট কম দামে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে পাটের আবাদে কৃষকের খরচ বেড়েছে। কিন্তু পাটের দাম ভলো না পেয়ে কৃষক হতাশ হয়ে অন্য আবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১৬ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। এর মধে সদর উপজেলায় এক হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে, আলমডাঙ্গা উপজেলায় সাত হাজার ৬৫৮ হেক্টর জমিতে, দামুড়হুদা উপজেলায় পাঁচ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে ও জীবননগর উপজেলায় এক হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। জেলার ৪৬% পাটের আবাদ হয়েছে আলমডাঙ্গা উপজেলায়।
সদর উপজেলার বোয়ালমারী গ্রামের কৃষক তুহিন আলী জানান, চলতি মৌসুমে আড়াই বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছিলাম। আমার ওই জমি থেকে ৩৫০ আটি পাট পেয়েছি। এ বছর পানি না থাকায় আমাদের গ্রাম থেকে তিন মাইল দূরে বোলিয়ারপুর গ্রামে আটি প্রতি ১৫ টাকা হারে গাড়ী ভাড়া দিয়ে পাট জাগ দিতে হয়েছে। এতে যাতায়াতে আমার সাড়ে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত খরচ হবে। গত বছর এ সময়ে দুই হাজার ৫০০ টাকা দরে এক মন পাট বিক্রি করেছি। কিন্তু এ বছর এক হাজার ৭০০ টাকা থেকে এক হাজার ৮০০ টাকায় এক মন পাট বিক্রি হচ্ছে।
তিনি জানান, প্রতি বিঘায় পাটের উৎপাদন খরচ দুই হাজার ৫০০ টাকার বেশি পড়বে। এক বিঘা জমি লিজ নিতে জমির মালিককে দিতে হয় ১৫ হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে গড়ে আট মন থেকে সাড়ে আট মন পাট উৎপন্ন হয়। খুব ভালো জমি হলেও ১০ মনের উপর পাট উৎপন্ন হয় না। ১বিঘা জমিতে ১০ মন পাট উৎপন্ন হলেও বর্তমান বাজার দরে পাট বিক্রি করলে ১৮ হাজার টাকা হয়। এছাড়া বৈরি আবহাওয়ায় পাটের মান ও উৎপাদন দুটোই কমেছে। বর্তমান বাজার দরে পাট বিক্রি করলে খরচ উঠবে না।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার হাটকালুগঞ্জ গ্রামের কৃষক সেখ আবুদল আজিজ জানান, আমি পৌণে দুই বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছিলাম। বৈরি আবহাওয়ায় এ বছর সেচ দিয়ে পাটের বীজ বপন করতে হয়েছে। বৃষ্টির অভাবে আরো দুটি সেচ দিতে হয়েছে। প্রতি সেচে খরচ হয়েছে ৬০০ টাকা। তিনটি নিড়ানি দিতে হয়েছে। প্রতি নিড়ানিতে সাতটি করে লেবার লেগেছে। তিনি জানান, লেবার প্রতি ৪৫০ টাকা খরচ হয়। আবার সারা বছর বৃষ্টি না হওয়ায় পাট খুব ভালো হয়নি। পাট জাগ দেয়ার কোন ব্যবস্থা করতে না পারায় মাঠ থেকে দুই মাইল দূরে ভিমরুল্লাহ জেলা কারাগারের পাশে ৪ হাজার ২০০ টাকা খরচ করে পাট জাগ দিচ্ছি। পাট থেকে আশঁ ছাড়ানোর পর বাসায় পৌঁছাতে প্রায় একই পরিমাণ খরচ হবে। তিনি বলেন, পরিবার নিয়ে বেচে থাকতে হলে পাটের বিকল্প আবাদ খুঁজতে আমাদের।
জীবননগর উপজেলার সুটিয়া গ্রামের কৃষক আজিজুর রহমান জানান, আমি চলতি বছর তিন বিঘা জমিতে পাটের আবাদ করেছিলাম। ওই জমি থেকে ২৭ মন পাট পেয়েছিলাম। এক হাজার ৮০০ টাকা মন দরে ৫০ হাজার টাকায় উৎপাদিত পাট বিক্রি করেছি।
আলমডাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন জানান, চলতি মৌসুমে আলমডাঙ্গা উপজেলায় সাত হাজার ৬৫৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, যা জেলার শতকরা ৪৬ ভাগ। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাটের আবাদ হয়েছে খাসকররা ব্লকে। মাটির উর্বরতার কারণে পাটের ফলনও বেশি হয়। এলাকায় ইন্ডিয়ান ভেরাইটি পাটের আবাদ বেশি হয়। বর্তমান পাটের আবাদের বড় সমস্যা পানির সমস্যা। তাছাড়া ব্যবসায়িক সিন্ডিকেটের কারণে পাটের দাম এ সময় কম থাকে। তবে রবি-৮ জাতের পাটের আবাদও কিছু কৃষক করছে। এর জীবনকাল বেশি হওয়ায় এ জাতের পাটের আবাদে অনীহা কৃষকদের।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি বিপণন কর্মকতা সহিদুল ইসলাম বলেন, জেলায় পাট রোপনের সময় পানির সংকটে সেচ দিয়ে পাট বপন করতে হয়েছে। বপনের পরও বৃষ্টি হয়নি বলে চলে, সেকারণে পাটের মান খুব ভালো হয়নি। চলতি বছর পাটের বাজার কম। তিনি জানান, আমাদের জেলায় পানির সংকটে নিম্ন ও মধ্যম পাট বেশি উৎপন্ন হওয়ায় আরো কম দামে পাট বিক্রি হচ্ছে বলে আমার কাছে মনে হয়েছে। মানুষ ভুট্টা কিনেছে এবার বেশী এমন কী কৃষকরা পর্যন্ত ভূট্টা স্টক করেছে। পাট কেনার ইচ্ছা থাকলেও অনেক গোডাউনে ভুট্টা কিনে ভর্তি করে রাখার কারণে পাটের নিবন্ধন শেষ পর্যন্ত আর করেনি। এই জন্য পাটের নিবন্ধন না করে ভূট্টার নিবন্ধন করেছে বলে হয়তো পাটের নিবন্ধন কম করেছে। এছাড়া তদারকীর অভাবে প্রতিটি বাজারে বা গ্রাম-গঞ্জে যেভাবে পাটের নিবন্ধন করে, সেভাবে চলতি বছর করেনি।
কৃষি-সম্প্রসারণ অধি-দফতরের উপ-পরিচালক বিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, চলতি মৌসুমে চুয়াডাঙ্গা জেলায় ১৬ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে, গত বছর ২০ হাজার ৫২৭ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছিলো। এ বছর পাটের আবাদ কম হওয়ার কারণ কৃষকভাইদের পাট জাগ দেয়ার সমস্যা। তিনি জানান, এই জায়গাগুলোতে পরবর্তীতে আউশের আবাদ হয়েছে। যেখানে গত বছর আউশের আবাদ হয়েছিলো ৩৮ হাজার ৬৯৯ হেক্টর জমিতে আর এ বছর সেই জায়গায় আউশের আবাদ হয়েছে ৪৩ হাজার ১৭ হেক্টর জমিতে। পাটের জমিগুলো আউশে স্থানান্তর হয়েছে। এছাড়া এখানে ব্যাপকভাবে গ্রীষ্মকালীন শাক সবজির আবাদ হয়। এখানে ফুলকপি, বাঁধাকপি সীমসহ বিভিন্ন শাকসবজি দুইবার/তিনবার রোপন করে কৃষকভাই লাভবান হচ্ছেন। পাট পচাতে কৃষকভাইদের অসুবিধা হচ্ছে। পাট গবেষণা ইনিস্টিউট আধুনিক প্রযুক্তিতে পাট জাগ দেওয়া, আঁশ ছড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে। পাটের এই আধুনিক প্রযুক্তি কৃষকের দৌড়গড়ায় পৌঁছে দিলে, কৃষকরা উপকৃত হবে। বাজার মূল্যেও ভালো পাবে। তিনি আরো জানান, পাশাপাশি পাটের পণ্য বিশেষ করে মোড়ক, ব্যাগ ও পাটের বিভিন্ন কুটির শিল্প ব্যবহারে যত্নশীল হতে হবে। পাটের মূল্য কৃষকভাই বেশি পেলে পাটের আবাদ আরো বাড়বে। উন্নত জাতের বীজ যেন কৃষক ভাই পায় এপারে চুয়াডাঙ্গা কৃষি অধিদফতর কাজ করে যাচ্ছে।
জেলায় কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় মোট ১৬ হাজার ৫৭৮ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে; ফলন হয়েছে ২.৭ মেট্রিক টন । জেলায় যার বিপরীতে দুই লাখ ৪৫ হাজার ৯৩৭.৩৬৩ বেলপাট উৎপাদন হয়েছে। । এক বিঘা জমিতে যদি গড়ে সাড়ে ৯ মণ বা ৩৩৫. ৮৮ কেজি পাট উৎপন্ন হয় তবে ১৬ হাজার ৫৭৮ হেক্টর বা এক লাখ ২৪ হাজার ৩৩৫ বিঘা জমিতে পাট উৎপন্ন হবে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৮৪৭ দশমিক ৫ মণ।
স্বাআলো/এসএস