রঘুনাথ খাঁ, সাতক্ষীরাঃ আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক তৎপরতা জোরদার করতে সাতক্ষীরায় পদযাত্রা ও পথসভায় অংশ নিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতারা।
শনিবার (১২ জুলাই) দিনব্যাপী তালা উপজেলা ও সাতক্ষীরা শহরে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সনদ, বিচার এবং নতুন সংবিধানের দাবি তুলে ধরেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশায় থাকা এই অঞ্চলের ভোটারদের মধ্যেও নেতাদের আগমনে উৎসাহ দেখা গেছে।
শনিবার কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ তালা উপজেলার কুমিরা ফুটবল মাঠে পৌঁছালে স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাদের ফুলেল সংবর্ধনা জানান। এসময় এলাকাজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। দলের কেন্দ্রীয় আহবায়ক নাহিদ ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের প্রায় এক ডজন নেতা এই সফরে অংশ নেন।
কুমিরায় সংক্ষিপ্ত পথসভা শেষে নেতৃবৃন্দ সাতক্ষীরা শহরের দিকে রওনা হন। দুপুর দেড়টার দিকে সাতক্ষীরা শহরের খুলনা রোড মোড়ে শহীদ আসিফ চত্বরে এক পথসভা অনুষ্ঠিত হয়।
পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহবায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, রোদ, বৃষ্টি, ঝড় উপেক্ষা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতৃবৃন্দ এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সনদ, বিচার এবং নতুন সংবিধান চেয়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
তবে তিনি অভিযোগ করেন, সকল জনদাবির বিপক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে একটি পক্ষ। তারা পুরাতন বন্দোবস্ত ধরে রাখতে চায়, পুরাতন রাজনীতি টিকিয়ে রাখতে চায় এবং চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিতে চায়। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পরে, এত মানুষের জীবন দানের পরে, তারা যদি মনে করে আগের পুরাতন রাজনীতি করবে, তাহলে তা এত সহজ হবে না। গণঅভ্যুত্থানের শক্তি এখনো মাঠে আছে এবং তাদের গর্জন এখনো রয়েছে।
চাঁদাবাজদের কবল থেকে ব্যবসায়ীদের রক্ষা করবো: নাহিদ ইসলাম
নাহিদ ইসলাম আরো বলেন, তারা ভেবেছিল দুই-তিনটা আসন দেখিয়ে, ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারার লোভ দেখিয়ে গণঅভ্যুত্থানের শক্তিকে কিনে নিবে। কিন্তু যারা বিপ্লবের শক্তি, যারা মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে, তাদেরকে কিনে নেয়ার সাধ্য কোনো রাজনৈতিক দলের হয়নি। তিনি বলেন, বলা হয়েছে দরজা নাকি খোলা আছে, আমরা ৫ আগস্ট দরজা খুলে দিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম—আসুন জাতীয় সরকার গঠন করি, দেশটাকে পুনর্গঠন করি, সকল বিভাজন সবকিছুর ঊর্ধ্বে গিয়ে বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলি। কিন্তু তারা সেই প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি।
তিনি বলেন, তারা বলেছিল তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে, আবার বলেছিল ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন দিতে হবে। ক্ষমতার ভাগ-বাটোয়ারা ছাড়া দেশ সংস্কারে তাদের কোনো সমর্থন পাওয়া যায়নি। তিনি পুনরায় ঐক্যবদ্ধভাবে দেশ পুনর্গঠনের আগ্রহ প্রকাশ করে বলেন, আমরা দেশের ভিতরে শত্রু তৈরি করতে চাই না। আমরা এখনো বলছি—নির্বাচনী ভাগ-বাটোয়ারা নয়, দেশ সংস্কারে আমাদের দরজা এখনো খোলা আছে। যদি এবার দরজা বন্ধ হয়, জনগণ আপনাদেরকে আর ক্ষমা করবে না।
সাতক্ষীরার স্থানীয় সমস্যা প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাতক্ষীরাবাসী উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা, যারা ঘূর্ণিঝড়সহ নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও এই দেশকে পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি সাতক্ষীরার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যাতায়াত ব্যবস্থার অব্যবস্থাপনার কথা তুলে ধরেন এবং ৫৪ বছর পরও সাতক্ষীরায় রেল সংযোগ না পৌঁছানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি জনতার উদ্দেশে উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও রেললাইন সংযোগ চান কিনা প্রশ্ন রাখেন। তিনি জলবায়ু রক্ষা, সুন্দরবন ও উপকূল রক্ষায় জাতীয় নাগরিক পার্টি কাজ করবে জানিয়ে সাতক্ষীরার মাটি ও মানুষকে রক্ষা করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
নাহিদ ইসলাম সাতক্ষীরাবাসীকে জাতীয় নাগরিক পার্টির সাথে থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, চাঁদাবাজদের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। যে দেশের ছাত্র ও মেহনতি জনতা ১৬ বছরের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে দিল্লি পাঠাতে পারে, সে দেশের ছাত্র-জনতা কোনো চাঁদাবাজকে ভয় পাবে না। তিনি ছাত্র জনতা ও নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে নতুন করে প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বৈষম্য ও দুর্নীতি বিরোধী ইনসাফ ভিত্তিক রাষ্ট্র গড়তে হবে, যা শহীদদের স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় এনসিপির সাংগঠনিক সম্পাদক সারজিস আলম বলেন, আমাদের যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছানোর পূর্ব পর্যন্ত এই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। জাতীয় নাগরিক পার্টির সাতক্ষীরা জেলার সমম্বয়ক কামরুজ্জামান বুলুর সভাপতিত্বে পথসভায় অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পার্টির দক্ষিণাঞ্চলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক মেজবাহ কামাল ও চিকিৎসক তাসনীম জারা। এছাড়া মঞ্চে স্লোগান দেন দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ।
পথসভার আগে কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ শহীদ আসিফ চত্বর এলাকায় জুলাই-বিপ্লবে আহত ও নিহত পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন। পরে একটি পদযাত্রা শহীদ আসিফ চত্বর থেকে বের হয়ে নিউমার্কেট মোড়ে শেষ হয়। এরপর নিউমার্কেট এলাকার আল বারাকা হোটেলের দ্বিতীয় তলায় জেলা কার্যালয় উদ্বোধন করেন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।
এই পদযাত্রা ও জনসমাবেশে শত শত নেতা-কর্মী অংশ নেন, যাদের অনেকেই ব্যানার, প্ল্যাকার্ড ও দলীয় পতাকা বহন করছিলেন। পদযাত্রা ও জনসমাবেশকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সড়ক ও জনপথ বিভাগের পক্ষ থেকে আগেই কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সংস্কার করা হয়েছিল।
স্বাআলো/এস
