তারিখ লোড হচ্ছে...
স্বাধীন আলো

সত্যের পথে, মানুষের পাশে

Sunday, 12 July 2026
অর্থনীতি

ইউরোপের পোশাক বাজারে চাপে বাংলাদেশ

Debu Mallick  |  01 July 2026

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপের ২৭টি দেশ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির প্রধান ভরসাস্থল হলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, সেই বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আগের মতো শক্তিশালী নেই। ইউরোপীয় ক্রেতারা ধীরে ধীরে বিকল্প সরবরাহকারী দেশের দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে ভারত, ভিয়েতনাম ও চীন নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে বা আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে।

ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পাশাপাশি কমেছে বাজার অংশীদারিত্ব এবং পোশাকের গড় মূল্য। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক চাহিদা কমার প্রভাব থাকলেও প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পতন বেশি হওয়ায় শিল্পটির ভবিষ্যৎ সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

ইইউ বাজারে বাংলাদেশের বড় পতন

ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি হয়েছে ৬ দশমিক ০৯ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৫ সালের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৭ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ইউরো।

অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ১ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ইউরো বা ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ।

একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট পোশাক আমদানি কমেছে ১০ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ইউরোপের বাজার সংকুচিত হলেও বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে বাজার সংকোচনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে।

এর ফলে ইইউর পোশাক বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ২১ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে।

শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বড় সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের বাজার অংশীদারিত্বের এই পতন সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

ভারতের অবস্থান শক্ত হচ্ছে

ইউরোপীয় বাজারে ভারতের পোশাক রপ্তানিও কমেছে, তবে বাংলাদেশের তুলনায় পতনের হার অনেক কম। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে ভারতের রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ১ শতাংশ।

ফলে ভারত বাজারে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই ধরে রাখতে পেরেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এগিয়ে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে অগ্রগতি দেশটির জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। অনেক আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ভবিষ্যতের শুল্ক সুবিধা বিবেচনায় ভারত থেকে পণ্য সংগ্রহ বাড়াচ্ছে।

এ ছাড়া ভারতের বিশাল টেক্সটাইল শিল্প, কাঁচামালের সহজলভ্যতা, ম্যান-মেড ফাইবার (এমএমএফ) ভিত্তিক পোশাক উৎপাদনের সক্ষমতা এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যভাণ্ডার দেশটিকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলো চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলের অংশ হিসেবে ভারতকে বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব দিচ্ছে।

চীন ভিয়েতনাম ধরে রেখেছে বাজার

বাংলাদেশের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ইউরোপীয় বাজারে বরং নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। চার মাসে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে মাত্র ৪ দশমিক ৬ শতাংশ।

ফলে ইইউ বাজারে চীনের অংশীদারিত্ব ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৮ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যেও চীনা উৎপাদকরা ইউরোপীয় বাজারে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যনীতি গ্রহণ করেছে। সরকারি সহায়তা, উন্নত অবকাঠামো, দ্রুত উৎপাদন সক্ষমতা এবং শক্তিশালী সরবরাহ ব্যবস্থা তাদের বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে।

অন্যদিকে ভিয়েতনাম সবচেয়ে ভালো অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশটির রপ্তানি কমেছে মাত্র ০ দশমিক ৭ শতাংশ। নিটওয়্যার রপ্তানি বরং বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।

ইইউ-ভিয়েতনাম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (ইভিএফটিএ), আধুনিক উৎপাদন ব্যবস্থা এবং দ্রুত সরবরাহ সক্ষমতার কারণে ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী হয়ে উঠছে।

শুধু অর্ডার নয়, কমেছে পোশাকের দামও

বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের আরেকটি বিষয় হলো রপ্তানি পণ্যের গড় মূল্য কমে যাওয়া।

চলতি বছরের জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে বাংলাদেশের প্রতি কেজি পোশাকের গড় মূল্য ১৫ দশমিক ৫৯ ইউরো থেকে কমে ১৩ দশমিক ৯৬ ইউরো হয়েছে।

অর্থাৎ কম অর্ডারের পাশাপাশি কম দামে পণ্য বিক্রি করতে হয়েছে রপ্তানিকারকদের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের মূল্য প্রতিযোগিতার চাপ বাড়ার ইঙ্গিত।

কেন পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোও বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।

এর মধ্যে রয়েছে—

  • উচ্চ ব্যাংক ঋণের সুদের হার
  • গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা
  • কাঁচামাল আমদানিতে দীর্ঘসূত্রতা
  • বন্দরে জট ও বেশি লিড টাইম
  • উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি
  • প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ধীরগতি

তৈরি পোশাক শিল্পের উদ্যোক্তাদের মতে, বাংলাদেশের বড় শক্তি ছিল কম খরচে বড় পরিমাণ উৎপাদন। কিন্তু এখন সেই সুবিধা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, ইউরোপে বাংলাদেশের রপ্তানি কমার পেছনে শুধু অর্ডার কমে যাওয়া নয়, ইউনিট মূল্য কমে যাওয়াও বড় কারণ। তার মতে, উৎপাদন ব্যয় কমানো, বন্দর ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে দ্রুত অগ্রসর হওয়া জরুরি।

বিকেএমইএর সাবেক সভাপতি ফজলুল হক বলেন, চীন ও অন্যান্য প্রতিযোগী দেশ বিভিন্নভাবে উৎপাদকদের সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও অর্থায়ন সংকটের কারণে অনেক কারখানা প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য দিতে পারছে না।

এলডিসি উত্তরণের আগে বড় চ্যালেঞ্জ

২০২৯ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণ করবে। এর পর ইউরোপীয় বাজারে বর্তমানে পাওয়া অনেক শুল্ক সুবিধা কমে যেতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এলডিসি উত্তরণের পর ভারত, ভিয়েতনাম ও অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হবে।

তাই এখনই উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বন্দর সংস্কার, সরবরাহ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন ও প্রযুক্তিনির্ভর পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত

সাম্প্রতিক তথ্য দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক বাজার সংকোচনের সময়ও সব দেশ একইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কেউ বাজার হারিয়েছে, কেউ আবার সংকটের মধ্যেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উদ্বেগের বিষয় হলো—একই সঙ্গে রপ্তানি আয়, বাজার অংশীদারিত্ব এবং পণ্যের গড় মূল্য—তিন ক্ষেত্রেই চাপ তৈরি হয়েছে।

তিন দশকের পরিশ্রমে ইউরোপের বাজারে তৈরি করা অবস্থান ধরে রাখতে হলে এখন শুধু কম দামের পোশাক উৎপাদন নয়, বরং মানসম্পন্ন পণ্য, দ্রুত সরবরাহ, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং বেশি মূল্যসংযোজনের দিকে যেতে হবে।

অন্যথায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের যে শক্ত অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তার একটি অংশ স্থায়ীভাবে প্রতিযোগী দেশগুলোর দখলে চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল

স্বাধীন আলো.com

আপনার এলাকার খবর জানান আপনি নিজেই!

যোগ দিন আমাদের "নাগরিক সাংবাদিকতা" গ্রুপে। আপনার চারপাশের সমস্যা, সম্ভাবনা বা জনদুর্ভোগের ছবি ও তথ্য পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। আমরা হব আপনার কণ্ঠস্বর।

📧 info@shadhinalo.com🟢 WhatsApp: 01783057931
খবর পাঠান (হোয়াটসঅ্যাপ)