জালিয়াতি ঠেকাতে আসছে ‘ফ্যামিলি ট্রি’

জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) জালিয়াতি রোধে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নতুন ব্যবস্থায় ভোটার হতে আবেদনকারীদের শুধু পিতা-মাতার নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের—বিশেষ করে ভাই-বোনের এনআইডির তথ্যও দিতে হবে।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি ও এনআইডি তৈরির ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই আরও নির্ভুল করতে ‘ফ্যামিলি ট্রি’ বা পারিবারিক তথ্যভান্ডার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে একটি পরিবারের সদস্যদের তথ্য একই কাঠামোর মধ্যে সংরক্ষণ করা হবে।
বর্তমানে এনআইডির জন্য আবেদন করার সময় সাধারণত পিতা ও মাতার এনআইডির তথ্য দিতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যের তথ্য যুক্ত হলে আবেদনকারীর পরিচয় যাচাই আরও সহজ হবে বলে মনে করছে ইসি।
রোহিঙ্গা ও জাল পরিচয় ঠেকাতে উদ্যোগ
ইসি কর্মকর্তারা জানান, মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের এনআইডি সংগ্রহ ঠেকাতে চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিশেষ ব্যবস্থায় ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা ও বিদেশি নাগরিকদের কেউ কেউ প্রতারণার মাধ্যমে এনআইডি নেওয়ার চেষ্টা করে থাকে।
কর্মকর্তাদের মতে, শুধু পিতা-মাতার এনআইডির তথ্য সংগ্রহের সুযোগ থাকায় দালালদের মাধ্যমে এসব তথ্য জোগাড় করা তুলনামূলক সহজ হয়। ভাই-বোনের তথ্য যুক্ত হলে যাচাই প্রক্রিয়া আরও কঠোর হবে।
এছাড়া দেশের নাগরিকদের মধ্যেও অনেকে অনৈতিকভাবে পিতা-মাতার নাম বা পরিচয় পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। পরিবারের অন্য সদস্যদের এনআইডির তথ্য থাকলে এসব অসঙ্গতি সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
কমবে এনআইডি সংশোধনের আবেদন
ইসির এনআইডি শাখার কর্মকর্তারা বলছেন, পরিবারের সবার তথ্য একসঙ্গে সংরক্ষিত থাকলে এনআইডি সংশোধনের আবেদন কমে আসবে। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিকের পরিচয় আরও নির্ভুলভাবে যাচাই করতে পারবে।
ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, “আমরা একটি ‘ফ্যামিলি ট্রি’ করার পরিকল্পনা করছি। কেউ একজন আবেদন নিয়ে এলে সেখানে তার পিতা-মাতা, কয়জন ভাই-বোন আছে এবং তাদের এনআইডির তথ্য দিতে হবে।”
তিনি বলেন, এই ব্যবস্থা চালু হলে এনআইডি জালিয়াতির সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে পরিবারের সবার তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যাবে এবং ভবিষ্যতে ওয়ারিশ সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি সহায়ক হবে।
ইসি সচিব জানান, ‘ফ্যামিলি ট্রি’ ব্যবস্থা বর্তমানে পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। প্রক্রিয়া শেষ হলে দ্রুত এটি বাস্তবায়ন করা হবে।
তথ্যের অসঙ্গতি থাকলে সংশোধনের সুযোগ
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই পরিবারের সদস্যদের এনআইডিতে পিতা-মাতার নামের বানানে পার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়ে ইসি সচিব বলেন, ভাই-বোনদের এনআইডিতে পিতা-মাতার নামের ভিন্নতা থাকা স্বাভাবিক নয়। এমন সমস্যা থাকলে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে আবেদন করে তথ্য সংশোধন করতে পারবেন।
তিনি বলেন, “আমরা চাই সবার এনআইডিতে একই ধরনের তথ্য থাকুক। এতে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম কমে আসবে এবং সংশোধনের আবেদনের সংখ্যাও কমবে।”
১২ কোটি ৮৩ লাখ নাগরিকের তথ্য ইসি সার্ভারে
বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের সার্ভারে ১২ কোটি ৮৩ লাখ ২৩ হাজার ২৪০ জন নাগরিকের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে পুরুষ ৬ কোটি ৫২ লাখ ১২ হাজার ৭৩১ জন, নারী ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯ হাজার ২৬৬ জন এবং হিজড়া জনগোষ্ঠীর নাগরিক রয়েছেন ১ হাজার ২৪৩ জন।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সরকারি-বেসরকারি প্রায় ২০২টি প্রতিষ্ঠান নাগরিকের পরিচয় যাচাইয়ের জন্য ইসির সার্ভারের তথ্য ব্যবহার করে থাকে।
‘ফ্যামিলি ট্রি’ ব্যবস্থা চালু হলে এসব প্রতিষ্ঠানের জন্যও পরিচয় যাচাই আরও সহজ ও নির্ভরযোগ্য হবে বলে মনে করছে নির্বাচন কমিশন।






