নির্দলীয় নির্বাচনে ফিরছে স্থানীয় সরকার

দীর্ঘ এক দশক পর স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবারও নির্দলীয় ব্যবস্থায় ফিরছে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকর হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন (ইসি) নতুন বিধিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে। কমিশনের লক্ষ্য, চলতি বছরের অক্টোবর থেকেই ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সূচনা করা।
তবে নির্বাচনের প্রস্তুতির পাশাপাশি বাড়ছে নতুন এক উদ্বেগ। আইন নির্দলীয় নির্বাচন বাধ্যতামূলক করলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাই শুরু করেছে। স্থানীয় পর্যায়ে ব্যানার, পোস্টার ও প্রচারণাও জোরদার হয়েছে। এতে অতীতের মতো দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল সহিংসতায় রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমএম নাসির উদ্দিনও প্রকাশ্যে এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি রক্তপাতমুক্ত নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারস্পরিক সমঝোতার আহ্বান জানিয়েছেন।
সিইসি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কোনো দলীয় প্রতীক থাকবে না। কিন্তু বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেভাবে নিজেদের প্রার্থী ঘোষণা ও সমর্থনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তা উদ্বেগের বিষয়।
তার ভাষায়, ‘সবাই যদি প্রকৃত অর্থেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হতেন, তাহলে দলীয় মালিকানার প্রশ্ন উঠত না, দলাদলি ও সংঘর্ষও অনেকাংশে কমে যেত।’
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সহিংসতার বাইরে রাখতে দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সমঝোতা প্রয়োজন। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর মতো শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’
নির্দলীয় নির্বাচন হলেও অতীতে সহিংসতার নজির রয়েছে। ২০১৪ সালে সাত ধাপে অনুষ্ঠিত উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দলীয় ছিল। কিন্তু প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দল অনানুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সমর্থিত প্রার্থী মাঠে নামায়। নির্বাচনী সহিংসতায় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে।
তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবদুল মোবারক নির্বাচন শেষে মন্তব্য করেছিলেন,‘ আইনের বাইরে দলীয় সমর্থনের কারণে সংঘাত ও প্রাণহানি বেড়েছে। ভবিষ্যতে বিষয়টি আইনের মাধ্যমে স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।’
পরবর্তীতে দশম জাতীয় সংসদে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার আইন পাস হয়। ২০১৬ সাল থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হতে থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিজয়ী হন। একই সঙ্গে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার প্রবণতা এবং দলীয় বিদ্রোহের কারণে সহিংসতাও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। নির্বাচন সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে অধ্যাদেশের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আবার নির্দলীয় করার বিধান আনা হয়। পরে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সেই বিধানকে আইনে পরিণত করে।
বর্তমানে সেই আইন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন নতুন বিধিমালা প্রস্তুত করছে।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিটির সদস্য ও নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী বলেন, ‘কেবল আইন পরিবর্তন করলেই হবে না; রাজনৈতিক দলগুলোকেও নির্দলীয় নির্বাচনের চেতনা মেনে চলতে হবে।’
তার মতে, নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত সংলাপ প্রয়োজন। কমিশনকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে কোনো ধরনের দলীয় সমর্থন নির্দলীয় নির্বাচনের উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও সংস্কার কমিটির সদস্য ড. আব্দুল আলীম বলেন, ‘দলীয় কিংবা নির্দলীয়Ñউভয় ব্যবস্থাতেই সহিংসতার ঝুঁকি রয়েছে। তবে নির্দলীয় নির্বাচনে যদি রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন দেয়, তাহলে সংঘাতের সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়।’
জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালা সংশোধনের কাজ চলছে। নির্বাচন কমিশন সব দিক বিবেচনা করেই নতুন বিধিমালা চূড়ান্ত করবে।






