বিদেশি বিনিয়োগে ফের ধস

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআই আবারও বড় ধরনের নিম্নমুখী প্রবণতায় ফিরেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) দেশে নিট বিদেশি বিনিয়োগ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। নতুন বিনিয়োগের চেয়ে মুনাফা বা মূলধন হিসেবে অর্থ প্রত্যাহারের হার বেড়ে যাওয়ায় দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বিনিয়োগের বর্তমান চিত্র
চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে দেশে মোট ১১০ কোটি ৪৩ লাখ ডলার বিদেশি বিনিয়োগ এলেও, একই সময়ে বিনিয়োগকারীরা ৬৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার মুনাফা বা মূলধন হিসেবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। ফলে প্রকৃত বা নিট বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪ কোটি ৭৩ লাখ ডলারে। অথচ গত বছরের (২০২৫) একই সময়ে নিট বিনিয়োগ ছিল ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ ডলার।
পরিসংখ্যান বলছে, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগ ও আন্তঃকোম্পানি ঋণ—উভয় ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পতন ঘটেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে নিট ইক্যুইটি বিনিয়োগ এসেছে মাত্র ৭ কোটি ৮২ লাখ ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৬ কোটি ৩৯ লাখ ডলার। একইভাবে আন্তঃকোম্পানি ঋণের পরিমাণ ৩৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার থেকে কমে মাত্র ২ কোটি ৬১ লাখ ডলারে নেমে এসেছে। তবে আশার কথা হলো, পুনর্বিনিয়োগকৃত আয়ের পরিমাণ ১৯ কোটি ১২ লাখ ডলার থেকে বেড়ে ৩৪ কোটি ২৯ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, বর্তমানে নতুন বিদেশি বিনিয়োগের চেয়ে বাংলাদেশে আগে থেকেই কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিনিয়োগই এফডিআই ধরে রাখার মূল ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিনিয়োগ কমার নেপথ্যে বিশেষজ্ঞরা
বিদেশি বিনিয়োগের এই নাজুক পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, “গত কয়েক বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশের ঘাটতির কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এই একই কারণে স্থানীয় বিনিয়োগও প্রত্যাশিত গতি পায়নি।” তবে তিনি আশাবাদী, নতুন সরকারের অধীনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকলে এবং সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগে বিনিয়োগের সুযোগ আবারও তৈরি হতে পারে।
‘নতুন সরকার এসেছে। রাজনীতিতে স্থিতিশীলতার আভাস দেখা যাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি খাত সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে এখন বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে’
এদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন এফআইসিসিআইর সভাপতি রূপালী হক চৌধুরী বলেন, “নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে উন্নত লজিস্টিকস, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ, মানসম্মত অবকাঠামো এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। সস্তা শ্রমশক্তি থাকলেও অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক সূচকে আমরা অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে আছি। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কাজে লাগাতে হলে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দ্রুত দূর করতে হবে।”
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা আঙ্কটাড প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬’ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে ১৭৮ কোটি ডলার এফডিআই এসেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৪৪ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি হলেও তা বিশ্ববাজারের তুলনায় নগণ্য। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ভারত গত বছর ৩৮ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন ডলার, পাকিস্তান ১৮৫ কোটি ডলার এবং শ্রীলঙ্কা ১০৪ কোটি ডলার এফডিআই পেয়েছে। এমনকি আফ্রিকার দেশ উগান্ডা, ঘানা ও ডিআর কঙ্গোর মতো দেশগুলোও বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন ইক্যুইটি বিনিয়োগের এই খরা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য শুভ নয়। নীতিগত স্থিতিশীলতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে কার্যকর সংস্কার ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগে কাক্সিক্ষত গতি ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এখন সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অবকাঠামোগত ও নীতিগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।






