বিশ্ববাজারে তেলের দরপতন দেশে এখনই কমছে না দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা কমে আসা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার পর গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ায় বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭২ থেকে ৭৩ ডলারে নেমে এসেছে। গত কয়েক মাসের মধ্যে এটি তেলের সর্বনিম্ন মূল্য।
তবে বিশ্ববাজারে এই দরপতনের সুফল এখনই দেশের সাধারণ ভোক্তারা পাচ্ছেন না। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, আগের লোকসান সমন্বয় করতে আপাতত দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর পরিকল্পনা নেই।
বিপিসির চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কম দামে তেল কেনা শুরু হলেও আগের উচ্চ মূল্যে আমদানি করা তেলের কারণে সংস্থাটিকে এখনো বড় ধরনের লোকসান বহন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আগে তেল কিনে বিপিসিকে প্রতি মাসে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিতে হতো। বিশ্ববাজারে দাম কমায় বর্তমানে সেই ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমেছে। তবে আগের লোকসান পুরোপুরি কাটিয়ে না ওঠা পর্যন্ত দাম কমানো কঠিন।”
এর আগে জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে গত মার্চ থেকে ১১ জুন পর্যন্ত আমদানি করা তেলের এলসি নিষ্পত্তির পর বিপিসির সঞ্চিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩৯ দশমিক ৫৬ কোটি টাকা।
তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের দাম ব্রেক-ইভেন পর্যায়ের ওপরে থাকায় বিপিসিকে দৈনিক প্রায় ৭৮ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও সাবেক বুয়েট অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারেও এর প্রভাব পড়া উচিত।
তিনি বলেন, “সরকার যে স্বয়ংক্রিয় মূল্য সমন্বয় পদ্ধতি চালু করেছে, সেটিকে আরও স্বচ্ছ ও কার্যকর করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে দ্রুত দেশের বাজারে মূল্য সমন্বয়ের ব্যবস্থা থাকা দরকার।”
তার মতে, জ্বালানি তেলের দাম কমলে পরিবহন খরচ ও নিত্যপণ্যের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিপিসির কর্মকর্তারা জানান, আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কেনা তেল দেশে পৌঁছাতে এবং আগের বেশি দামে কেনা মজুত শেষ হতে সাধারণত ২ থেকে ৩ সপ্তাহ সময় লাগে।
এ ছাড়া ডলারের মূল্যবৃদ্ধি ও টাকার অবমূল্যায়নের কারণেও আমদানির প্রকৃত খরচ এখনো বেশি রয়েছে।
বর্তমানে সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী দেশের বাজারে প্রতি লিটার অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা এবং ডিজেল ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল আমদানিতে খরচ প্রায় ১২৯ টাকা। ফলে ডিজেলে লোকসান থাকলেও অকটেন ও পেট্রোল বিক্রিতে কিছুটা লাভ করছে সংস্থাটি।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার দেশের তেল মজুত সক্ষমতা ৪৫ দিন থেকে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এ লক্ষ্যে পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানিকে নতুন ট্যাংক স্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের জন্য জি-টু-জি চুক্তির আওতায় ১৬ লাখ টন তেল কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম স্থিতিশীল থাকলে এবং সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আগামী মাসগুলোতে বাংলাদেশের ভোক্তারাও এর সুফল পেতে পারেন।






