বেলুচ মানবাধিকারকর্মী মাহরাং বেলুচের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড

পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ মানবাধিকারকর্মী ডা. মাহরাং বেলুচকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন কোয়েটার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে গোয়াদরে অনুষ্ঠিত একটি বিক্ষোভের সময় আধাসামরিক বাহিনীর এক সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় হত্যা ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে তাকে এ সাজা দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার পর পাকিস্তানসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
সরকারি কৌঁসুলিদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গোয়াদরে অনুষ্ঠিত ‘বেলুচ রাজী মুচি’ (বেলুচ জাতীয় সমাবেশ) চলাকালে মাহরাং বেলুচ উসকানিমূলক বক্তব্য দেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, এর পর উত্তেজিত জনতা লাঠি ও পাথর নিয়ে আধাসামরিক বাহিনীর একটি গাড়িতে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া শাব্বির আহমেদ নামে এক সদস্য নিহত হন।
আদালত প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকদের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ডা. মাহরাং বেলুচ এবং তার সহকর্মী সিবঘাতুল্লাহকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি ২ লাখ পাকিস্তানি রুপি জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ নিহত সদস্যের পরিবারকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মাহরাং বেলুচ ২০২৫ সালের মার্চ থেকে কারাগারে রয়েছেন।
রায়ের পর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ও কর্মীদের মধ্যে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সুইডিশ জলবায়ু কর্মী গ্রেটা থুনবার্গ এই বিচার প্রক্রিয়াকে “ন্যায়বিচারের প্রহসন” বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে বিচার প্রক্রিয়াটি পরিচালিত হয়েছে।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা দাবি করেছেন, কারাগারে থাকা আসামিদের পক্ষে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া ব্যক্তিদের যথাযথভাবে জেরা করার সুযোগ দেওয়া হয়নি। মাহরাং বেলুচের বোন নাদিয়া বেলুচ এবং তার আইনজীবী ইসরার জাট্টাক রায়কে অন্যায্য ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে উচ্চ আদালতে আপিল করার ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে বেলুচিস্তান সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। প্রাদেশিক সরকারের এক মুখপাত্র দাবি করেন, প্রসিকিউশনের কাছে অভিযোগ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।
বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি বলেন, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর হামলা বা সহিংসতার সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে।
৩৩ বছর বয়সী চিকিৎসক মাহরাং বেলুচ বেলুচিস্তানের মানবাধিকার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ। তার আন্দোলনের পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত জীবনের গভীর ট্র্যাজেডি। ২০০৯ সালে তার বয়স ১৬ বছর থাকাকালে তার বাবা ও রাজনৈতিক কর্মী আবদুল গফ্ফার নিখোঁজ হন। দুই বছর পর তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকেই মাহরাং নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং মানবাধিকার রক্ষার দাবিতে সক্রিয় হন।
তিনি বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি -এর নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ২০২৩ সালের শেষ দিকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের দাবিতে শত শত নারীকে নিয়ে ইসলামাবাদ পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পদযাত্রা করে আলোচনায় আসেন তিনি।
মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকার জন্য তিনি ২০২৪ সালে বিবিসি ১০০ নারী-এর তালিকায় স্থান পান এবং ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাহরাং বেলুচের বিরুদ্ধে এই রায় পাকিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ ও কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বেলুচিস্তানের টানাপোড়েনের মধ্যে এ ধরনের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।






