ব্লু-ইকোনমিতে বড় পরিকল্পনা সরকারের

দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভরতা কমানো এবং দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন বাড়াতে ব্লু-ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক সম্পদ কাজে লাগাতে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি স্থলভাগে নতুন কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের আশা, এই উদ্যোগ সফল হলে ভবিষ্যতে আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামুদ্রিক অর্থনীতির অন্যতম বড় সম্ভাবনা রয়েছে ব্লু-ইকোনমিতে। সমুদ্রের তলদেশে সম্ভাব্য গ্যাস ও তেলের মজুত আবিষ্কার করা গেলে শুধু বিদ্যুৎ ও শিল্প খাতের জ্বালানি চাহিদাই পূরণ হবে না, আমদানি ব্যয় কমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দক্ষ জনবল তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দীর্ঘমেয়াদি, ধারাবাহিক নীতিগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ডলারের ওপর চাপ এবং আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কেনায় বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের কারণে সরকার এখন দেশীয় গ্যাস ও তেলের উৎস অনুসন্ধানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদন কার্যক্রম জোরদারে ২ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘আমরা আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি থেকে বের হয়ে দেশীয় সম্পদ অনুসন্ধানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। বঙ্গোপসাগরের ২৬টি ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় অভিজ্ঞ আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে কাজের সুযোগ দিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই।’
সরকারের এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরের ২৬টি অফশোর ব্লকে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্র এবং ১১টি অগভীর সমুদ্রের ব্লক। বিদেশি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করতে উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি আধুনিকায়ন করা হয়েছে। নতুন চুক্তিতে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে গ্যাসের মূল্য নির্ধারণের সুযোগ রাখা হয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় বলে মনে করা হচ্ছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, নতুন নীতির ফলে ইতোমধ্যে সিঙ্গাপুর, জাপান, নরওয়ে ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি দরপত্রে অংশ নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট তথ্যভান্ডার (ডেটা প্যাকেজ) সংগ্রহ করেছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ‘সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের পাশাপাশি স্থলভাগেও উৎপাদন বাড়ানোর জন্য বাপেক্স এবং চুক্তিভিত্তিক রিগের মাধ্যমে ২০২৮ সালের মধ্যে মোট ১০০টি নতুন ও পুরোনো কূপে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নিজস্ব গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।’
সমুদ্রের পাশাপাশি স্থলভাগেও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাপেক্স এর সক্ষমতা বাড়িয়ে ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে ৬৯টি নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন এবং ৩১টি পুরোনো কূপে ওয়ার্কওভার (সংস্কার) করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, স্থলভাগে দ্রুত গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো গেলে স্বল্পমেয়াদে বিদ্যমান গ্যাস সংকট কিছুটা লাঘব করা সম্ভব হবে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সরকারের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছেন। তাদের মতে, সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি একটি প্রক্রিয়া। আন্তর্জাতিক দরপত্র, চুক্তি, ভূতাত্ত্বিক জরিপ, অনুসন্ধান, আবিষ্কার এবং উৎপাদনে যেতে অনেক বছর সময় লাগে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম তামিম বলেন, ‘দেশীয় খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। তবে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান থেকে উৎপাদনে যেতে সাধারণত ৭ থেকে ১০ বছর সময় লাগে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার পাশাপাশি স্বল্পমেয়াদে স্থলভাগের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক দরপত্র ও চুক্তি প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত থাকে, সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।’






