‘হারিয়ে গেল’ ৬২ হাজার শিক্ষার্থী!

সারাদেশে একযোগে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর মধ্যেই সামনে এসেছে উদ্বেগজনক এক বাস্তবতা। যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২০২৪ সালে এসএসসি পাস করা প্রায় ৬২ হাজার শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। অর্থাৎ, মাধ্যমিক পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মূলধারার শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বোর্ডের অধীনে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৭৭ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। অথচ ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে মাত্র ৮৬ হাজার ৭৮৪ জন। ফলে ৬১ হাজার ৭৯৩ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। শতাংশের হিসাবে এটি মোট এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। বিপরীতে মাত্র ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসএসসি থেকে এইচএসসি পর্যায়ে প্রায় ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার বাইরে থেকে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন। এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না, তা খতিয়ে দেখে ঝরে পড়া রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সংকট তৈরি করেছে বলে মনে করেন তারা।
জেলাভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যশোর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ২০২৪ সালে এসএসসি পাশ করা সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না যশোর জেলায়। ওই বছর যশোর জেলায় এসএসসি পাস করেছিল ২৮ হাজার ৫৯৩ জন। এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে তাদের ১৫ হাজার ৪৯১ জন। অর্থাৎ ১৩ হাজার ১০২ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে রয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কুষ্টিয়া, যেখানে ৮ হাজার ১২৯ জন এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না। এরপর রয়েছে খুলনা ৭ হাজার ৯১৪ জন, ঝিনাইদহ ৭ হাজার ৫৩৬ জন, সাতক্ষীরা ৬ হাজার ৯৪৫ জন, বাগেরহাট ৬ হাজার ২১৮ জন, মাগুরা ৩ হাজার ৯৮৮ জন, চুয়াডাঙ্গা ৩ হাজার ২৮৭ জন, নড়াইল ২ হাজার ৫৯৫ জন এবং মেহেরপুর ২ হাজার ৭৯ জন। সবচেয়ে কম সংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে রয়েছে মেহেরপুর জেলায়।
এদিকে, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত বাংলা প্রথম পত্র পরীক্ষায় যশোর শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন ২৪০টি কেন্দ্রে মোট ৮৬ হাজার ৭৮৪ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৮৪ হাজার ৭০৬ জন অংশ নেয়। অনুপস্থিত ছিল ২ হাজার ৭৮ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ২ দশমিক ৩৯ শতাংশ। গত বছর একই বিষয়ের পরীক্ষায় অনুপস্থিতির হার ছিল ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। সে হিসাবে এ বছর অনুপস্থিতির হার ০ দশমিক ৬১ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক এসএম হোসেন আলী স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষা চলাকালে অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে ঝিনাইদহের বারোবাজার কেন্দ্র থেকে দুইজন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সার্বিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বাংলা প্রথম পত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, এসএসসি থেকে এইচএসসি পর্যায়ে প্রায় ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার বাইরে থেকে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এত বড় সংখ্যক শিক্ষার্থীর মূলধারার উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোস্তাফিজুর রহমান শিম্বা বলেন, ‘নানা কারণেই আমাদের দেশে এসএসসি পাসের পর প্রতিবছরই কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। তবে এবার ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি। এর অন্যতম কারণ ২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতা, যার প্রভাব ২০২৫ সালজুড়েও শিক্ষাক্ষেত্রে ছিল। এ সময়ে শিক্ষকরা নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন, আর অনেক শিক্ষার্থীও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে, বিশেষ করে রাজনৈতিক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছিল। ফলে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ ব্যাহত হয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার নেতিবাচক প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থার ওপর পড়ায় উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিক্ষার্থী এবার এইচএসসি পরীক্ষার আগেই ঝরে পড়েছে।’
তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি আশাবাদী। তাঁর মতে, যেহেতু এখন একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্বে রয়েছে এবং জনগণের প্রতি তাদের জবাবদিহিতা রয়েছে, তাই সরকার শিক্ষাক্ষেত্রের অস্থিরতা দূর করতে প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে। পাশাপাশি গত কয়েক বছরে শিক্ষাক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কীভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়েও সরকার আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।






