
চলমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধির বড় ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছে দুই শীর্ষ উন্নয়ন সহযোগীÑবিশ্ব ব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। গত ছয় মাসে সংস্থা দুটি বাংলাদেশকে মোট ৩২১ কোটি ৫৮ লাখ মার্কিন ডলার জরুরি ঋণ ও বাজেট সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি চূড়ান্ত করেছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে আগামী ৫ বছরের জন্য আরও ৫০০ কোটি ডলারের বিশাল একটি মহাপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এডিবি।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল ঋণের বড় অংশই ব্যয় হবে দেশের জরুরি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সার আমদানি, জ্বালানি তেল-গ্যাস কেনা এবং ভঙ্গুর ব্যাংক খাতের বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রমে।
চলতি সপ্তাহের ২৬ জুন বিশ্ব ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশের জন্য পৃথক দুটি প্রকল্পের আওতায় ১১০ কোটি ডলার জরুরি তহবিল অনুমোদন করেছে। বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছে, চলমান সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান বিভিন্ন প্রকল্পের অব্যবহৃত অর্থ পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে এই জরুরি তহবিল গঠন করা হয়েছে।
শুক্রবার বিশ্ব ব্যাংকের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশে দুটি প্রকল্পের জন্য এ ঋণ অনুমোদনের তথ্য জানানো হয়।
বিশ্ব ব্যাংক বলছে, এ সহায়তার ফলে সংকটকালেও কর্মসংস্থান ধরে রাখা এবং মানুষের আয়-রোজগার সচল রাখতে সহায়তা করবে।
এ ছাড়া খাদ্য, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ ও পানির মতো জরুরি সেবা চালু রাখতে প্রয়োজনীয় তেল ও গ্যাস আমদানির ব্যয়ও এই প্রকল্পের অর্থ থেকে মেটানো হবে।
বিশ্ব ব্যাংক জানিয়েছে, জরুরি সাড়াদান প্রকল্পের পুরো অর্থ আগামী বুধবারের মধ্যে ছাড় করা হবে।
এই ঋণের আওতায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি ৩০ কোটি ডলার ব্যয় হবে। যা দিয়ে আগামী আমন ও বোরো মৌসুমে কৃষি উৎপাদন সচল রাখতে ৫ লাখ টন ইউরিয়াসহ ৬ লাখ টন জরুরি সার আমদানি করা হবে। এর ফলে দেশের প্রায় ১৪ লাখ হেক্টর ফসলি জমিতে ধান চাষ নিশ্চিত হবে। বাকি ৭১ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করা হবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ক্ষুদ্র শিল্পে নগদ অর্থ সহায়তা এবং বিদ্যুৎ-জ¦ালানি খাতের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে তেল-গ্যাস আমদানির পেছনে। এই ঋণের পুরো অর্থ আগামী সপ্তাহের বুধবারের (৩০ জুন) মধ্যেই ছাড় করা হবে বলে নিশ্চিত করেছে বিশ্ব ব্যাংক।
ব্যাংক খাত সংস্কাওে প্রথম বড় ঋণ
এর আগে দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে এবং আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে ৪৫ কোটি ডলারের একটি বিশেষ ঋণ অনুমোদন করেছে বিশ্ব ব্যাংক। ২৪ জুন অনুমোদিত এই ঋণের মূল লক্ষ্য হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি ক্ষমতা জোরদার করা, খেলাপি ঋণের লাগাম টানা এবং ছোট আমানতকারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এডিবির দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা
এদিকে গত মে মাসে এডিবির প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশের সাথে এককভাবে সবচেয়ে বড় আর্থিক চুক্তিগুলো সম্পন্ন হয়। এডিবি ৪টি প্রধান প্রকল্পের আওতায় সামাজিক সুরক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার জন্য ১৪১ কোটি ৫৮ লাখ ডলারের ঋণ চুক্তি সই করেছে। যার মধ্যে ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলারই সরাসরি ‘বাজেট সহায়তা’ হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য সংকটের ক্ষতিপূরণ হিসেবে অতিরিক্ত আরও ২৫ কোটি ডলার জরুরি ঋণ বাড়িয়েছে সংস্থাটি।
একই সাথে এডিবি ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত আগামী ৫ বছরের জন্য ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি সামগ্রিক অর্থায়ন প্যাকেজ বা কান্ট্রি পার্টনারশিপ স্ট্র্যাটেজি ঘোষণা করেছে। এর আওতায় প্রতি বছর সংস্থাটি বাংলাদেশকে গড়ে ১০০ কোটি ডলার করে দেবে। যা মূলত জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ব্যবহার করা হবে।
কোনো অর্থ ছাড় করেনি আইএমএফ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলÑআইএমএফ থেকে গত ছয় মাসে কোনো নতুন অর্থ ছাড় করা হয়নি। বরং পূর্বের ঋণ কর্মসূচি বাতিল করে নতুন মেয়াদে বড় উদ্ধার প্যাকেজের দরকষাকষি শুরু হয়েছে। ২০২৩ সালে অনুমোদিত ও পরবর্তীতে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হওয়া প্যাকেজের আওতায় বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ৫টি কিস্তিতে মোট ৩৮০ কোটি ডলার পেলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দেশের পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাকি ১৭০ কোটি ডলারের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। এই স্থবিরতা কাটাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করতে গত ৯ জুন বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্বের কর্মসূচি থেকে বের হয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকার আইএমএফ-এর কাছে সম্পূর্ণ নতুন শর্তে আগামী ৩ বছরের জন্য প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি (৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারের একটি নতুন আর্থিক সহায়তার আবেদন করেছে। এই নতুন ঋণ প্যাকেজ ও কাঠামোগত অর্থনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা চূড়ান্ত করতে আগামী জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে আইএমএফ-এর একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর যে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছিল, বিশ্ব ব্যাংক ও এডিবির এই দ্রুত ঋণ ছাড়ের ফলে তা অনেকটাই কেটে যাবে। তবে ঋণের অর্থ যাতে যথাযথভাবে উৎপাদনশীল খাতে এবং ব্যাংক খাতের প্রকৃত সংস্কারে ব্যয় হয়, তা কঠোরভাবে নজরদারি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, জ্বালানি আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং সরকারি খাতের চাপ কমাতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ।



