তারিখ লোড হচ্ছে...
স্বাধীন আলো

সত্যের পথে, মানুষের পাশে

Sunday, 12 July 2026
উপ-সম্পাদকীয়

অনলাইন জুয়ায় অর্থনীতির রক্তক্ষরণ

Debu Mallick  |  01 July 2026

ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় অনলাইন জুয়া বা বেটিং আজ এক অন্ধকারের নাম। এক সময় জুয়া কেবল নির্দিষ্ট কিছু ক্লাব বা উৎসবের অনুষঙ্গ হলেও, আধুনিক প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় এটি এখন প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয়। স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের অপব্যবহারকে পুঁজি করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে এক ভয়াবহ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্যানসার। ক্রিকেট বা ফুটবলের মতো বড় টুর্নামেন্ট এলেই শহর থেকে গ্রাম—সবখানেই সক্রিয় হয়ে উঠছে জুয়াড়ি চক্র, যা দেশের অর্থনীতিকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দিচ্ছে।

অনলাইন জুয়া আজ কেবল একটি সামাজিক অপরাধ নয়, এটি এখন দেশীয় মুদ্রা পাচারের সবচেয়ে বড় আধুনিক হাতিয়ার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বেটিং সাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধ উপায়ে বিদেশে পাচার হচ্ছে। জুয়াড়িরা স্থানীয় এজেন্টদের মাধ্যমে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করছে। পরবর্তী ধাপে এই বিশাল অঙ্কের টাকা ডিজিটাল হুন্ডি, বিনান্স বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে রূপান্তর করে পাচার করা হচ্ছে রাশিয়া, মালয়েশিয়া ও দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তথ্যমতে, শুধু একটি চক্রই দৈনিক কোটি কোটি টাকা লেনদেন করছে, যা সরাসরি দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর আঘাত হানছে।

এই মরণফাঁদের প্রধান শিকার দেশের তরুণ ও যুবসমাজ। দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনে পড়ে শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বেকার যুবকেরা জুয়ার নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছে। জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে তারা জড়িয়ে পড়ছে চুরি, ছিনতাই এবং প্রতারণার মতো অপরাধে। অনেক ক্ষেত্রে সর্বস্ব হারিয়ে আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নেওয়ার ঘটনাও এখন নিয়মিত খবরের কাগজের শিরোনাম। একটি সম্ভাবনাময় প্রজন্মের এই নৈতিক ও মানসিক অবক্ষয় দেশের ভবিষ্যতের জন্য চরম বিপদের সংকেত।

ব্রিটিশ আমলের ১৮৬৭ সালের জুয়া আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন অপরাধীরা পার পেয়ে আসছিল। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার সম্প্রতি কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে এবং বিএফআইইউ (BFIU) ইতোমধ্যে জুয়া ও হুন্ডির সঙ্গে জড়িত সন্দেহে প্রায় ৫৫ হাজার মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট জব্দ করেছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ বা অ্যাকাউন্ট জব্দ করে এই বিশাল নেটওয়ার্ক পুরোপুরি উপড়ে ফেলা সম্ভব হচ্ছে না। অপরাধীরা প্রতিনিয়ত ভুয়া এনআইডি ব্যবহার করে নতুন সিম ও অ্যাকাউন্ট খুলছে, যা আইনি লড়াইকে কঠিন করে তুলেছে।

এই মহামারি থেকে মুক্তি পেতে হলে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে একযোগে সমন্বিত ভূমিকা পালন করতে হবে। বিটিআরসি (BTRC)-এর মাধ্যমে জুয়ার সাইট ও অ্যাপসগুলোকে স্থায়ীভাবে ব্লক এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় জুয়ার বিজ্ঞাপন দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট ও সন্দেহজনক লেনদেনের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চালাতে হবে। সবচেয়ে জরুরি হলো সচেতনতা—শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক পর্যায়ে জুয়ার কুফল তুলে ধরার পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানদের ইন্টারনেটের ব্যবহারের বিষয়ে আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।

অনলাইন জুয়ার এই রাক্ষুসে জাল যদি এখনই সম্পূর্ণভাবে ছিন্ন করা না যায়, তবে তা আমাদের অর্থনীতি ও সমাজকে পঙ্গু করে দেবে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অভিযানের পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধই পারে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে এই অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং দেশের অর্থপাচার রোধ করে একটি টেকসই অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে।

নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টাল

স্বাধীন আলো.com

আপনার এলাকার খবর জানান আপনি নিজেই!

যোগ দিন আমাদের "নাগরিক সাংবাদিকতা" গ্রুপে। আপনার চারপাশের সমস্যা, সম্ভাবনা বা জনদুর্ভোগের ছবি ও তথ্য পাঠিয়ে দিন আমাদের কাছে। আমরা হব আপনার কণ্ঠস্বর।

📧 info@shadhinalo.com🟢 WhatsApp: 01783057931
খবর পাঠান (হোয়াটসঅ্যাপ)